ওড়নাবিহীন দিনগুলো

বাংলাদেশের নারীরা সাধারণত তিন থেকে চার স্তরের কাপড় পরে। প্রথমে থাকে ব্রা বা ওই জাতীয় আন্ডারগার্মেন্ট, তার উপর জামার কাপড় অনুযায়ী সেমিজ থাকে, এরপর থাকে আসল কামিজ এবং তার উপর একটা ওড়না নামের একটা এক্সট্রা কাপড় যা দিয়ে স্পেশালি বুকের অংশটুকু ঢাকা থাকে। একজন সোশ্যালি অকওয়ার্ড অনারীসূলভ আচরণসম্পন্ন নারী হিসেবে ওড়না জিনিসটা আমার কাছে উটকো ঝামেলা মনে হয়। আমি অলরেডি তিন স্তরের কাপড় পরে আছি, তার উপর কেন আরেকটা কাপড় পরে আমার পুরুষদের বলতে হবে ‘প্লিজ এদিকে তাকিয়েন না’ বা ‘There’s a hidden treasure here. To unlock it you have to buy me from my father.’

Ugh disgusting! তাই আমি বেশ কিছুদিন আগে অবশেষে এই উটকো ঝামেলাটা ছুড়ে ফেলে দিলাম। আমার নতুন ক্যাজুয়াল ড্রেস হলো জিন্স, লং শার্ট/ফতুয়া আর একটা লম্বা ফিতাওয়ালা ব্যাগ যা কাঁধে আড়াআড়িভাবে ঝুলিয়ে রাখি। যেখানেই যাই না কেন, যতই কনজার্ভেটিভ জায়গা হোক না কেন, ওড়না ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করি। এই কাজটা করতে শুরু করার পর বেশ কিছু ব্যাপার লক্ষ্য করলাম।

ওড়না ডিচ করার পর থেকে আমার নিজেকে খুব ফ্রি মনে হচ্ছে। আগে পথেঘাটে চলতে গেলে ওড়না ঠিক করায় আমার ২০% মনযোগ থাকতো। ঠিক জায়গায় আছে নাকি, সরে গেল নাকি, কিছু দেখা যাচ্ছে নাকি এসব চিন্তা সবসময় মাথায় ঘুরপাক খেত। কিন্তু এখন আর এই চিন্তাটা মাথায় থাকে না। দুই হাত খালি থাকে বলে রাস্তাঘাটে নিজেকে সামলানো আরো সহজ হয়ে গিয়েছে।

আগে কোন লোক আমার চোখ ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকালে সবার আগে দেখতাম ওড়না ঠিক আছে কিনা। অবচেতনভাবে ওই লোকের দৃষ্টিটাকে নিজের দোষ বলে মেনে নিতাম। আর এখন কেউ এভাবে তাকালে শরীর শক্ত করে কটমট করে তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। সে প্রায় সাথে সাথেই চোখ সরিয়ে নেয়। বাসে বা রিকশায় এখন পর্যন্ত একবারও টিজড বা হ্যারাস হই নি। একবার শুধু লেগুনায় এক থুড়থুড়ে বুড়ো চাচা তাকিয়ে ছিল। আমি পাল্টা তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম পুরোটা রাস্তা। বাকিটা পথ সে আমার দিক ছাড়া অন্য সব দিকে তাকিয়ে থেকেছে।

ওড়না ছাড়া চলার সবচেয়ে বড় উপকারটা হচ্ছে নিজের মধ্যে অন্যরকম একটা কনফিডেন্স চলে আসে। প্রথম দুই একদিন একটু জবুথুবু হয়ে থাকতাম। এরপর খেয়াল করলাম কোন ছেলে আমার দিকে তাকালে আমার চোখের দিকেই তাকায়, ভুলেও বুকের দিকে তাকায় না। ওদিকে চোখ গেলেও সাথে সাথে সরিয়ে নেয়। এই ব্যাপারটা খেয়াল করার পরই নিজের মধ্যে অদ্ভুত একটা আত্মবিশ্বাস চলে আসল যা আগে ছিল না। এখন কোন নির্লজ্জ যদি বুকের দিকে তাকিয়ে থাকেও আমি তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি, একবার তো তার দিকে তাকিয়ে তার পাশাপাশি হাঁটা শুরু করেছিলাম। ওই লোক দ্বিতীয়বার ফিরে তাকানোর সাহস পায় নি। 

অনেক ভেবে ভেবে এই আচরণের একটা ব্যাখ্যা পেয়েছি। সকল নির্লজ্জ পুরুষ মেয়েদের বুকের উপর ওড়না দেখে অভ্যস্ত। ওড়না হচ্ছে আমাদের দেশে মডেস্টির প্রতীক, যে মেয়ের ওড়না যত বড় সে তত ভদ্র। আর বেশিরভাগ বখাটেই মনে করে ভদ্র মেয়েদের রাস্তাঘাটে টিজ করে পার পেয়ে যাওয়া যায়। এরা যখন কারো গায়ে ওড়না না দেখে তখন একটা ধাক্কার মত খায়। নিজের অজান্তেই তারা মেয়েটাকে অন্যরকম ভাবা শুরু করে। মনে করে যে রাস্তাঘাটে হ্যারাস হলে এই মেয়ে চুপ করে থাকবে না। তাই কষ্ট করে হলেও এরা এরকম মেয়েদের দিকে বাজেভাবে তাকায় না, গায়ে হাত দেয়া তো দূরের কথা। গায়ে পরে ঝামেলায় কে ই বা জড়াতে চায়!

ওড়না ছেড়েছিলাম ‘গায়ের কাপড় ঠিক না থাকলে তো টিজড হবেই’ বা ‘পর্দা না করলে তো ধর্ষন হবেই’ টাইপ মেন্টালিটি ফাইট করতে। ওড়না ছাড়ার পর একবারও ফিজিক্যাল হ্যারাসমেন্টের স্বীকার হতে হয় নি আমার- এটা প্রমান যে ওইসব কথাবার্তার কোন ভিত্তিই নেই (অবশ্য কমন সেন্স থাকলে এটা এমনিতেই বুঝে যাওয়ার কথা)। আমি জানি ওড়না ছাড়া চলা সবার জন্য সম্ভব না। আমি ঢাকা শহরের বেশ ভালো একটা অংশে থাকি বলে হয়ত আমার তেমন কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না। তাই আমি বলছি না আপনিও আপনার ওড়না নাম এক্সট্রা বোঝাটা বিসর্জন দিয়ে দিন। কিন্তু নিজের জায়গা থেকে একটু একটু করে মেয়েদের বিরুদ্ধে থাকা সামাজিক ট্যাবুগুলোকে ফাইট করুন। এভাবে সবাই যুদ্ধ করতে শুরু করলে একদিন এমন আসবে যেদিন আর আমাদের আর ফাইট করতে হচ্ছে না।

3 thoughts on “ওড়নাবিহীন দিনগুলো

  1. apnar soroir akta cheler kache koto ta lovoniyo se bepare je apni khub valoi obohito seta apnar lekha pore bujte parchi. apni nijer cholaferay sajchonder jonno orna pora chere diyechen. apni apnar chokher kathinnota diye purusder bojhate chaichen ‘There’s a hidden treasure here. To unlock it you have to buy me from my father.’ apnar chokher kathinnota dekhe akta chele samoyik vabe nijeke samlate parleo rater ghumtake kintu ato sohoje samlano jayna. tokhon ki apni tar kane kane giye bolte parben taratari ghumiye poro noile tomar kopale SUNI ache. BEPAR TA HOJCHE, CHOKHER SAMNE TOSTOSE PAKA AAM REKHE BOLA HOJCHE ATA KHAOWA JABE NA. APur niKOT BiNiTO niBEDon ai Je, chELrA JatE DUsChiNTA MUKto raT kaTAtE pARE sei BiSoye DRisti raKHAr joNNO AKul AbedON roiLO.

    Like

  2. প্রথম কথা, আমি একজন মানুষ, ফুলফল না। আমার পাশের বাসার সামনে আমগাছে প্রতি বছরই আম ঝুলে থাকে। আমি তাদেরটা পেড়ে খাই না, খেতে ইচ্ছা হলে দোকান থেকে কিনে খাই।
    আর রাস্তায় ওড়না ছাড়া একটা মেয়েকে দেখে যদি আপনি নিজেকে সামলাতে না পারেন তবে আমার মনে হয় আপনার যৌন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত কারন এটা নরম্যাল নয়।

    Liked by 1 person

  3. Hi Naila, very well written post. I think u r right- the amount comfort and confidence that can be given by western clothing and by being uninhibited about your body is truly amazing.

    Besides, to the above commenter, if u r so concerned about women’s breasts and u think that it cannot let boys sleep at night, then consider this- how about I say that you have a dick in the middle of your two legs and that doesn’t let us sleep at night? Shouldn’t men go to extraordinary lengths to cover that too? Both men and women have sexual desires , acknowledge that and like Naila said- go and see a therapist.

    Liked by 1 person

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s