ধর্ম নিয়ে আলোচনা কেন করতে হবে

ধর্ম নিয়ে কোন কিছু লিখতে গেলে সবার প্রথমেই শুনতে হয় ‘এত সেন্সিটিভ জিনিস নিয়ে কথা বলা উচিত না। আলোচনা করার বিষয়ের কি অভাব আছে নাকি?’

এই কথাটা বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার সময়ে শুনতে হয় না, সাহিত্য নিয়ে সমালোচনার সময়ে শুনতে হয় না, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিনোদন এমনকি মানুষের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে ডিসকাশনের সময়ও কেউ বাধা দেয় না। শুধু ধর্মের ব্যাপারেই মানুষের সব অনুভূতিগুলো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সে অনুভূতিগুলো রক্ষা করার জন্য মানুষ খুন করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না।

কোন একটা টপিক বাই বর্ন সেন্সিটিভ হয় না, তাকে মানুষই আদর সোহাগ দিয়ে দিয়ে সেন্সিটিভ বানায়। আমরা সবাই সেই পরিবারটাকে চিনি যেখানে তিন-চারটা মেয়ের পর একটা ছেলে জন্ম নিয়েছে। সেই ছেলে পরিবারের সবার চোখের মণি, কখনো তার ভুলের জন্য শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, তার সেই ভুলটাকে জায়েজ করে ফেলা হত। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় এই ছেলেটা বড় হয়ে বখাটেতে পরিনত হয়। ধর্ম হচ্ছে এই আদরের ছোট্ট ছেলে যাকে লাই দিয়ে দিয়ে আমরা মাথায় তুলেছি।

আমরা ভুলে যাই যে পৃথিবীর সব ধর্মকেই সমালোচনার মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে। যদি ভলতেয়ার, থমাস পেইন, ইমানুয়েল কান্ট খ্রিস্টান ধর্মের সমালোচনা না করতেন বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় হিন্দুধর্মের সংস্কার না করতেন তবে এই ধর্মগুলোর সেই প্রাচীন বর্বর রীতিনীতির কখনো সংস্কার হত না। অন্যান্য সব ম্যাস ধর্মের তুলনায় ইসলাম বেশ নতুন একটা ধর্ম। যুগের সাথে তাল মেলাতে হলে এখনো প্রচুর সমালোচনা ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে একে আসতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা এই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। তাদের যতই বোঝানো হোক না কেন তারা কোন পরিবর্তন মেনেই নেবে না। এই ব্যাপারটা বেশি দেখা যায় সদ্য মুসলিম অঞ্চলগুলোতে।

এর একটা কারন হচ্ছে- কোরআনে স্পষ্ট করে বলা আছে যে ইসলাম হচ্ছে সর্বশেষ ধর্ম, এর কোন সংস্কার হবে না। এ ব্যাপারটা পূর্বের অন্য কোন ধর্মে ছিল না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখন পর্যন্ত যত ধর্ম টিকে আছে প্রত্যেকটিকেই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হয়েছে। ইসলামের মধ্যে এই স্বাধীনতাটা নেই। যেমন- খ্রিস্টান ধর্ম এখন সমকামীদের মেনে নিচ্ছে। কিন্তু ইসলাম এ রকম ঘোষনা কখনো দিতে পারবে না কারন বলাই আছে কোরআনে যা লেখা আছে তাই এবসল্যুট, এর কোন ধরনের পরিবর্তন অসম্ভব (যদিও কোরআন মোহাম্মদ সঃ লিখে রেখে যায় নি, তার মৃত্যুর বেশ কিছু সময় পর সংকলিত হয়েছে মাত্র)।

তবে এতে মডারেট মুসলিম পুরুষ/পুরুষবাদী নারীদের কিন্তু কোন সমস্যা হয় নি। তারা ঠিকই তাদের জীবনে ধর্ম আর আধুনিকতাকে মিশিয়ে নিয়েছে। একদিকে এরা যেমন দুর্নীতি করে হারাম টাকা কামাচ্ছে, বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক করছে তেমনি আরেক দিকে নাস্তিকদের খুনে উল্লাস প্রকাশ করছে। তারা কিন্তু ঠিকই ইসলামের নিয়মকানুনকে নিজেদের মত করে বেঁকে সংস্কার করে ব্যবহার করছে। কিন্তু কেউ যখন এসে এটার যুক্তিসংজ্ঞত ব্যাখ্যা দিচ্ছে তখন হঠাৎ করে তাদের ‘ধর্মানুভূতি’ জেগে উঠছে। যখন দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয় তখন তাদের ধর্মানুভূতি জাগে না, একের পর এক বাচ্চা খুন হয় তখন ধর্মানুভূতি জাগে না, প্রতিদিন একজন দুজন করে বাচ্চা, নারী ধর্ষন হয় তখন তাদের ধর্মানুভূতি জাগে না। আর আমাদের দেশে এই হিপোক্রেট মডারেট মুসলমানের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

সবচেয়ে মজা লাগে যখন দেখি এই মডারেটরা কোন জঙ্গি আক্রমনের পর বলে ‘ওরা সহিহ মুসলিম নয়’ বা ‘ওরা সহি ইসলাম পালন করে না’। এখানে মজার জিনিসটা হচ্ছে জঙ্গিদের প্রতিটা আক্রমণের ভিত্তি হচ্ছে সরাসরি কোরআনের আয়াত। তারা যা করছে তার সবকিছুই কোরআনে করতে বলা আছে। জঙ্গিরা কিন্তু একটা আয়াত বা নির্দেশও ভুল বলে না, ভুল পালন করে না। এটা তারা মানুষকে জবাই করার ভিডিও করার সময়ই চিৎকার করে বলে। মডারেটরা দুই একটা সূরা বাদে অন্য কিছু না পারলেও উগ্রপন্থী, জঙ্গিরা কোরআন, হাদিসে হাফেজ হয়ে থাকে। তাদের কাছে কিন্তু তারা তাদের ধর্ম সঠিকভাবে পালন করছে। তাদের ধর্মে বলা আছে পৃথিবীতে যে করেই হোক ইসলামের শাসন কায়েম করতে হবে, তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে তা পালন করার চেষ্টা করছে। উগ্রপন্থী, জঙ্গিদের কাছে এই মডারেট মুসলিমরাই হচ্ছে বিশ্বাসঘাতক, কাফের। এই ভিত্তিতেই কিছুদিন আগেও কিন্তু আইসিস এক মুসলিম বাচ্চা ছেলেকে মিউজিক শোনার জন্য খুন করেছে।

এদের মধ্যে সঠিক কে? ওয়েল সেটা আসলে কোন ম্যাটার করে না। একদল আরেকদলকে অস্বীকার করলেই অন্য দলের হিপোক্রেসি, অপরাধ করা বন্ধ হয়ে যাবে না। সত্যি কথা হচ্ছে মডারেট মুসলমানদের এই আচরণ উগ্রপন্থী, জঙ্গিদের আরো সাপোর্ট দেয়। সরকারের মডারেটপন্থী আচরন, ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বিচারহীনতার কারনেই এখন দেশে ধর্মের নামে প্রতিদিন একজন মানুষ খুন হয়। প্রথমে তারা নাস্তিকদের খুন করেছে, তারপর বিধর্মীদের। এরপর কিন্তু তারা আসবে ধর্ম থেকে বিচ্যুতদের কল্লা নিতে। মডারেটরা যদি সত্যিই চায় তাদের এই আরামের জীবন কন্টিনিউ করতে চায় যেখানে তারা পর্ন দেখে হাত ধুতে এসে অন্যকে পর্ন বানানোর জন্য গালি দিতে পারবে তবে কট্টরধর্মী জঙ্গিদের থামানো ছাড়া উপায় নেই। নাহলে একদিন ওই নাস্তিক, বিধর্মী, কাফেরের মত কল্লাটা শরীর থেকে আলাদা অবস্থায় রাস্তায় বেঘোরে মরে পরে থাকতে হবে।

পৃথিবী থেকে একদিন ধর্ম নামের ভয়াবহ ফ্যান্টাসি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত নিরাপরাধ মানুষগুলো একটু শান্তিতে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করাটা কি উচিত না?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s