বিষাক্ত পুরুষত্ব!

‘এত নারীবাদ নারীবাদ যে করেন, কখনো তো বেকার ছেলে বিয়ে করবেন না।’, ‘বেকার প্রেমিকের সাথে ব্রেকাপ করে ভালো বেতনের চাকরি দেখে বিয়ে করে ছেলের ঘাড়ে বসে পুরুষতন্ত্রের বিরোধীতা করবেন।’, ‘পুরুষ হবার যন্ত্রনা মেয়েরা কি বুঝবে? ওদের তো এত দায়িত্ব নিতে হয় না।’

এই টাইপের কমেন্ট যে জীবনে কতবার দেখসি তার হিসাব নাই। নারী মুক্তি নিয়ে কোন কথা বললেই সবার আগে এরা এই যুক্তি নিয়ে আসে। মহান যুক্তিবাদী, আপনি কি জানেন, এই যে পুরুষদের ভালো টাকা আয় করতে হবে, পরিবারের হাল ধরতে হবে, সবার দায়িত্ব নিতে হবে, স্ট্রং পাওয়ারফুল হতে হবে – এ সবই পুরুষতান্ত্রিকতার ফল?

মানবজাতির শুরুতে কিন্তু নারীপুরুষে তেমন কোন বিভাজন ছিল না। ছোট ছোট যাযাবর দলের নারী-পুরুষ সবাই মিলে শিকার করতো, ফলমূল জোগাড় করতো; যা পাওয়া যেতো সেটা ভাগাভাগি করে খেতো। পুরুষ নারীদের নিজের চেয়ে কম, দুর্বল মনে করতো না। সন্তান জন্ম দিয়ে বংশ রক্ষার ক্ষমতার জন্য নারীদের গুরুত্ব একটু বেশিই ছিল।

এরপর মানুষ কৃষিকাজ আবিষ্কার করলো। যাযাবর জীবন থেকে তাদের একটা স্থায়ী আবাস হল। সভ্যতার হাত ধরে সৃষ্টি হল পুরুষতান্ত্রিকতার। পুরুষরা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব, নারী হচ্ছে তাদের সয্যাসঙ্গিনী মাত্র। যে সন্তান জন্মদানের জন্য নারীকে দেবী ভাবা হত তাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে বানানো হল একটা সন্তান উৎপাদন যন্ত্র। তার দায়িত্ব নেয়ার জন্য দরকার হল শক্তিশালী পুরুষের। শুরু হল পুরুষত্বের রাজত্ব।

এই পুরুষকে হতে হবে শক্তিশালী, গম্ভীর, দৃঢ় পার্সোনালিটির, নিতে হবে পরিবারের, সমাজের সকলের দায়িত্ব। কোন অবস্থাতেই ভয় পাওয়া যাবে না। পুরুষের থাকতে হবে প্রচন্ড যৌনক্ষুধা, তার যৌনাঙ্গ হতে হবে সবার থেকে বড়। সে যৌন অক্ষম হতে পারবে না, তাকে সন্তানের জন্মদাতা হতেই হবে। সে দেখতে সুদর্শন হবে কিন্তু নিজের রূপ নিয়ে কোন চর্চা করতে পারবে না। সে কখনো কোন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবে না, দুঃখ পেতে পারবে না, ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারবে না, ক্লান্তি প্রকাশ করতে পারবে না। কাঁদতে পারবে না। তাকে অনুভূতিশূন্য হতে হবে। অনুভূতি মানেই দুর্বলতা। আসল পুরুষ কখনোই দুর্বল হবে না।

এরকম আরো অনেক কিছুই আছে দিয়ে আমরা এখনো ‘আসল পুরুষ’কে ডিফাইন করি। ছেলে মারামারি করতে চায় না- সে পুরুষ না। ছেলের মধ্যে এগ্রেসিভনেস নেই- সে প্যাতপ্যাতা, ছোট যৌনাঙ্গের অধিকারী। ছেলে মাঠে খেলাধুলা করতে চায় না- যা বাড়িয়ে গিয়ে চুড়ি পরে থালাবাটি খেল। ছেলে নিজের সৌন্দর্য নিয়ে সচেতন- তুই গে নাকি রে! ছেলে স্ত্রীর সাথে মিলে সংসারের সব কাজ করে- মাইগ্যা, বৌয়ের আঁচলের তলে থাক। ছেলে বেকার/ঘরজামাই/হাউসহাজব্যান্ড – শালার পুরুষত্ব নাই। ছেলে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম – সে আসল পুরুষ না।

এসব চিন্তাভাবনা সবই কিন্তু পুরুষতান্ত্রিকতার দান। নারীবাদ এগুলোর বিরোধীতা করে। নারীবাদ বলে তোমাদের সবকিছুর দায়িত্ব নেয়ার দরকার নেই। নারীর সাথে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেও। এতে তোমার পুরুষত্ব কমে যাবে না, আমার নারীত্ব বেড়ে যাবে না। কারন পুরুষত্ব, নারীত্ব বলে কিছু নাই। শক্তিশালী না হলেও তুমি পুরুষ, সন্তান জন্ম না দিতে পারলেও তুমি পুরুষ, মারামারি করতে না পারলেও তুমি পুরুষ, কাঁদলেও তুমি পুরুষ, ভালোবাসা প্রকাশেও তুমি পুরুষ, ভয় পেলেও তুমি পুরুষ। তুমি নিজেকে যা মনে করো তুমি তাই। নারীবাদ শুধুই নারীর উন্নতি না, নারীবাদ পুরুষের উপর নারীর কতৃত্ব না। নারীবাদ মানে সকলের সমান অধিকার, সমান দায়িত্ব, সমান কর্তব্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s